সাতাশতম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এক সাবেক সহযোদ্ধার ফিরে দেখা:
কিছু সংবাদপত্রের জন্ম হয় ব্যবসার প্রয়োজনে, কিছু সংবাদপত্রের জন্ম হয় সময়ের প্রয়োজন থেকে। কিন্তু এমন কিছু সংবাদপত্র আছে, যাদের জন্ম হয় সত্য বলার এক দুর্দমনীয় তাগিদ থেকে। তাদের পথ মসৃণ হয় না, যাত্রাপথে বিছানো থাকে কাঁটা। কখনো ক্ষমতার রক্তচক্ষু, কখনো প্রভাবশালীর হুমকি, কখনো মামলা-হামলা, কখনো অর্থনৈতিক সংকট—সবকিছুকে পাশ কাটিয়েই তাদের এগিয়ে যেতে হয়।
‘নির্ভীক সংবাদ’ তেমনই এক সংবাদপত্র।
যে সংবাদপত্রের জন্মের সঙ্গে অঙ্গীকার ছিল—বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করব, অপ্রিয় হলেও সত্য প্রকাশ করব, অবহেলিত মানুষের কথা বলব এবং অন্যায়ের সামনে মাথা নত করব না—তার ২৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নিছক একটি বার্ষিকী নয়; এটি বাংলাদেশের সাংবাদিকতার এক দীর্ঘ সংগ্রামী অধ্যায়ের স্মারক।
২০০১ সালের ১ সেপ্টেম্বর পাক্ষিক ‘নির্ভীক সংবাদ’ যখন সংবাদপত্রের জগতে যাত্রা শুরু করে, তখন সামনে ছিল না কোনো মসৃণ পথের নিশ্চয়তা। ছিল না বড় কোনো পুঁজির নিশ্চয়তা, ছিল না ক্ষমতাবানদের আশ্রয়। ছিল একদল তরুণ ও নবীন সংবাদকর্মী, ছিল স্বপ্ন, ছিল সাহস এবং ছিল মানুষের কথা বলার অঙ্গীকার।
সেই অঙ্গীকারের সামনে ছিলেন পত্রিকাটির মালিক, সম্পাদক ও প্রকাশক আ আ ম একরামুল হক (আসাদ)—একজন দুঃসাহসী ও আপসহীন কলমসৈনিক। তাঁর নেতৃত্বে শুরু হয়েছিল যে ছোট্ট অভিযাত্রা, সময়ের স্রোতে তা আজ ২৭ বছরের ইতিহাস।
এই ইতিহাস কেবল কাগজে ছাপা অক্ষরের ইতিহাস নয়। এটি ঘাম, শ্রম, ত্যাগ, ঝুঁকি, সাহস এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার ইতিহাস।
সত্য প্রকাশের মূল্য কখনো কম নয়
সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা তখনই, যখন সত্যটি অপ্রিয়।
ক্ষমতাবানদের প্রশংসা করা সহজ। প্রভাবশালীদের ইচ্ছামতো সংবাদ ছাপা সহজ। কিন্তু যে কৃষক তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত, যে শ্রমিক তার মজুরি পায় না, যে নারী নির্যাতনের শিকার, যে শিশু শ্রমের অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে, যে পরিবার বিচার পেতে বছরের পর বছর ঘুরছে—তার পাশে দাঁড়িয়ে সত্যটি প্রকাশ করা সহজ নয়।
‘নির্ভীক সংবাদ’ সেই কঠিন পথটিই বেছে নিয়েছিল।
দেশের প্রত্যন্ত ও অবহেলিত জনপদ থেকে উঠে আসা মানুষের কান্না, অভাব, বঞ্চনা ও দুর্দশা এই পত্রিকার পাতায় স্থান পেয়েছে। অশিক্ষা-কুশিক্ষা, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম, সামাজিক নিপীড়ন এবং নানা অনিয়মের সংবাদ প্রকাশের মধ্য দিয়ে পত্রিকাটি বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে—সংবাদপত্র শুধু খবরের কাগজ নয়; সংবাদপত্র মানুষের শেষ আশ্রয়ও হতে পারে।
কোনো ঘটনা ঘটল, সংবাদ প্রকাশ হলো—এতেই দায়িত্ব শেষ নয়। ঘটনার পেছনের ঘটনা কী, দায়ী কারা, কেন ঘটল, প্রশাসন কোথায়, বিচার কেন হচ্ছে না—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সাংবাদিকতাই প্রকৃত সাংবাদিকতা।
‘নির্ভীক সংবাদ’ সেই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার চর্চা করার চেষ্টা করেছে। অনেক প্রতিবেদনের মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। অনেক অন্যায় প্রকাশ্যে এসেছে। অনেক নিপীড়িত মানুষ কথা বলার সাহস পেয়েছেন।
মামলা-হামলা ভয় দেখাতে পারেনি
বাংলাদেশে ক্ষমতার বিরুদ্ধে সত্য বলা কখনোই ঝুঁকিমুক্ত ছিল না।
যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, সংবাদমাধ্যম যখন অন্যায়, দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে, তখনই কোনো না কোনোভাবে চাপ এসেছে। কখনো বিজ্ঞাপনের চাপ, কখনো প্রশাসনিক চাপ, কখনো মামলা, কখনো হুমকি—গণমাধ্যমকে নানাভাবে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।
‘নির্ভীক সংবাদ’ও এসব প্রতিকূলতার বাইরে ছিল না।
বরং তার নামের সঙ্গে যেন ভাগ্যের মতো জড়িয়ে ছিল—নির্ভীক থাকার পরীক্ষা।
মামলা এসেছে, হামলার ভয় এসেছে, ক্ষমতাবানদের রক্তচক্ষু এসেছে। কিন্তু কলম থামেনি। কারণ সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো সাংবাদিকের কাছে ভয় কোনো চূড়ান্ত সত্য নয়। চূড়ান্ত সত্য হলো—জনগণের জানার অধিকার।
এই জায়গাটিই ‘নির্ভীক সংবাদ’-এর সবচেয়ে বড় শক্তি।
একটি পত্রিকা, বহু সাংবাদিকের পাঠশালা
২৭ বছরের পথচলায় ‘নির্ভীক সংবাদ’-এর আরেকটি বড় অর্জন—এটি বহু তরুণ সাংবাদিকের হাতে-কলমে শেখার জায়গা তৈরি করেছে।
প্রথম যাত্রায় যারা তরুণ ও নবীন সংবাদকর্মী হিসেবে যুক্ত হয়েছিল, তাদের অনেকেই আজ দেশ-বিদেশের খ্যাতনামা সংবাদমাধ্যমে সাংবাদিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। কেউ কেউ নিজেরাই সংবাদপত্রের মালিক, সম্পাদক ও প্রকাশক হয়েছেন।
একটি সংবাদপত্রের জন্য এর চেয়ে বড় উত্তরাধিকার আর কী হতে পারে?
একজন সাংবাদিকের হাতে শুধু কলম তুলে দেওয়া নয়, তাকে সত্য অনুসন্ধানের সাহস শেখানো—এটাই সাংবাদিকতার প্রকৃত শিক্ষা।
এই অর্থে আ আ ম একরামুল হক (আসাদ) শুধু একটি পত্রিকা পরিচালনা করেননি; তিনি অনেক তরুণের সাংবাদিকতা-জীবনের ভিত গড়ে দিয়েছেন। আজ তাঁর হাতে গড়ে ওঠা অনেক সাংবাদিক যখন নিজ নিজ ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করছেন, তখন ‘নির্ভীক সংবাদ’-এর ইতিহাস তাদের মধ্যেও বেঁচে আছে।
আমার নিজের ফিরে দেখা
‘নির্ভীক সংবাদ’-এর ২৭ বছরের ইতিহাসের সঙ্গে আমার নিজের জীবনও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এই পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে আমার পথচলা শুরু। সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছি। এরপর এক যুগেরও বেশি সময় নিষ্ঠার সঙ্গে নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছি।
পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, সেটি ছিল শুধু একটি কর্মজীবনের অধ্যায় নয়—ছিল একটি পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘ পথচলা।
সংবাদ সংগ্রহ, সম্পাদনা, প্রকাশনা, সংকট, আনন্দ, দুশ্চিন্তা—কত স্মৃতি যে জমে আছে এই পত্রিকার সঙ্গে! কত রাত নির্ঘুম কেটেছে একটি প্রতিবেদন ঠিকঠাক করার জন্য, কত সংবাদ নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, কতবার মনে হয়েছে সামনে হয়তো নতুন বিপদ—তারপরও পরদিন পত্রিকা বেরিয়েছে।
এই স্মৃতিগুলো এখন ইতিহাস।
স্বাধীনতার পর দেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত সংবাদপত্রেও কাজ করার সুযোগ আমার হয়েছে—অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলার বাণী, দৈনিক খবর, সাপ্তাহিক মুক্তিবাণী, দৈনিক সংবাদ প্রতিদিন, দৈনিক পূর্ববী, The Daily News Star, সাপ্তাহিক একুশেসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি।
আজ নিজের সম্পাদনা ও প্রকাশনায় অনলাইন পত্রিকা ‘গ্রাম বাংলার বাণী’ পরিচালনা করছি। কিন্তু পেশাগত জীবনের নানা অধ্যায়ের মধ্যেও ‘নির্ভীক সংবাদ’-এর জায়গাটি আলাদা। কারণ এখানে শুধু সাংবাদিকতা করিনি; একটি পত্রিকার বেড়ে ওঠার সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে যেতে দেখেছি।
২৭ বছর মানে শুধু বয়স নয়, একটি উত্তরাধিকার
আজ ‘নির্ভীক সংবাদ’ ২৭ বছরে পা দিয়েছে।
২৭ বছর একটি সংবাদপত্রের জন্য নিছক সময়ের হিসাব নয়। এটি একটি প্রজন্মের স্মৃতি। এটি বহু মানুষের শ্রমের হিসাব। এটি পাঠকের আস্থার হিসাব। এটি অসংখ্য সংবাদকর্মীর স্বপ্নের হিসাব।
সময়ের সঙ্গে সংবাদমাধ্যম বদলে গেছে। ছাপাখানার পাশাপাশি এসেছে অনলাইন। কাগজের পাতার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এসেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। সংবাদ এখন মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যায়।
কিন্তু প্রযুক্তি বদলালেও সাংবাদিকতার মূলনীতি বদলায় না।
সত্য সত্যই থাকবে। অন্যায় অন্যায়ই থাকবে। মানুষের অধিকার মানুষের অধিকারই থাকবে।
তাই নতুন সময়ের ‘নির্ভীক সংবাদ’-এর সামনে দায়িত্বও নতুন। ঐতিহ্যকে ধারণ করে ডিজিটাল বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আরও অনুসন্ধানী, আরও তথ্যনির্ভর, আরও সাহসী এবং আরও জনমুখী সাংবাদিকতার পথে এগিয়ে যেতে হবে।
কারণ সময় যতই বদলাক, মানুষের সত্য জানার প্রয়োজন কখনো শেষ হবে না।
শেষ কথা
২৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে তাই ‘নির্ভীক সংবাদ’-এর কাছে আমার একটাই প্রত্যাশা—নামটি যেন শুধু পত্রিকার নাম হয়ে না থাকে; তার প্রতিটি অক্ষরে যেন নির্ভীকতার পরিচয় থাকে।
যে কলম অন্যায়ের বিরুদ্ধে উঠেছিল, সে কলম যেন কখনো নত না হয়।
যে পত্রিকা নিপীড়িত মানুষের কথা বলেছিল, সে পত্রিকা যেন মানুষের কাছ থেকে দূরে না সরে যায়।
যে সংবাদপত্র অপ্রিয় সত্য প্রকাশের অঙ্গীকার নিয়ে জন্মেছিল, সে যেন জনপ্রিয়তার লোভে সত্যকে বিসর্জন না দেয়।
কারণ সংবাদপত্রের আয়ু কাগজে নয়—মানুষের হৃদয়ে।
২৭ বছরের এই দীর্ঘ পথচলায় যাঁরা কলম ধরেছেন, সংবাদ সংগ্রহ করেছেন, পত্রিকা সাজিয়েছেন, ছাপাখানায় শ্রম দিয়েছেন, পাঠকের হাতে পত্রিকা পৌঁছে দিয়েছেন, বিজ্ঞাপন ও আর্থিক সহযোগিতা করেছেন, কিংবা নিঃশব্দে পাশে থেকেছেন—সবার প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।
আর অগণিত পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী—আপনারাই ‘নির্ভীক সংবাদ’-এর প্রকৃত শক্তি।
আপনাদের আস্থা নিয়েই পথ চলেছে এই পত্রিকা। আপনাদের ভালোবাসাই তাকে বারবার প্রতিকূলতার দেয়াল ভেঙে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দিয়েছে।
আজ তাই আনন্দের সঙ্গে, গর্বের সঙ্গে উচ্চারণ করতে চাই—
শুভ হোক সেই দিন, যেদিন অপ্রিয় সত্য বলার সাহস নিয়ে ‘নির্ভীক সংবাদ’-এর জন্ম হয়েছিল।
শুভ হোক তার ২৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।
বেঁচে থাকুক সত্যের পক্ষে উচ্চারিত নির্ভীক কলম।
বেঁচে থাকুক গণমানুষের সংবাদপত্র।
বেঁচে থাকুক ‘নির্ভীক সংবাদ’—যতদিন মানুষের সত্য জানার অধিকার বেঁচে থাকবে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা একেএম করম আলী
সম্পাদক ও প্রকাশক
গ্রাম বাংলার বাণী (অনলাইন পত্রিকা)
সাবেক নির্বাহী সম্পাদক, নির্ভীক সংবাদ
Leave a Reply